উত্তমাধিকারী

 

বছর আট-নয় আগের এক হয়ে-আসা সন্ধে। খানিক আগেই তুমুল বৃষ্টি, আপাতত সব শান্ত। অতিরিক্ত ধৌত হতে-হতে গোধূলির রং মেখে নিয়েছে গাছের পাতাও। দূরে, কারখানার চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া। সাইকেলের ক্রিং। এমনই এক দৈব মফস্বলে হাজির হয়েছি ছাদে। ভেজা পাঁচিলে ভর দিয়ে দাঁড়ানো। নিচের রাস্তায় শেষবৃষ্টির লোকজন। কী মনে পড়ছে আমার? কলেজপড়ুয়া আমি-র মধ্যে ফুটে উঠছে কোন দৃশ্য?

ক্যামেরা থাকলে ভালো হত। অথচ সে-আমল সহজক্যামেরার নয়। ফলে, তুলনা অনর্থক। আর তুলনা করবই বা কোন সাহসে! যে গান গুনগুনিয়ে উঠছি, মনে পড়ছে গান-সংলগ্ন দৃশ্যও, তাতে অন্য কেউ মানায় না। কোনো জীবেন বসু অপেক্ষা করে নেই ছাদে। আমিও, নেহাৎ একটা গানের জোরে উত্তমকুমার হতে পারলাম কই! ছাদ রইল, গানও— মাঝখান থেকে ব্যর্থ উত্তম-অনুকরণে আরও সাধারণ করে তুললাম নিজেকে। ভাগ্যিস ক্যামেরা ছিল না!

এও কিন্তু সত্যি, প্রতিটা কথা সেদিন বিশ্বাস করেছিলাম গানের। উত্তমকুমার শিখিয়েছিলেন বিশ্বাস করতে। ‘বসে আছি পথ চেয়ে’ থেকে ‘যত ভাবি ভুলে যাব, মন মানে না’-তে পৌঁছে সত্যিই ভেবেছিলাম, রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখব কাউকে। কিংবা ছাদের দরজায়। ‘তুমি ওগো তুমি মোরে/বেঁধেছ যে মায়াডোরে’শুধু উত্তমকুমার নই বলেই কি একটা ছবির মতো সন্ধে-মফস্বল ব্যর্থ হয়েছিল সেদিন?

কাউকে দোষ না দিলে, নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকা যায় না কিছুতেই। খেয়াল করে দেখেছি, অন্তত প্রথম যৌবন পর্যন্ত আমার বেশিরভাগ আচরণেরই দায় চাপাতাম উত্তমের কাঁধে। হ্যাঁ, তিনি দায়ী বইকি! জ্ঞান হওয়ার পর থেকে, যখন চার-পাঁচ বছর বয়স, নব্বই দশকের সেই শেষ-মুহূর্তেই বাড়িতে হাজির হয়েছিল রঙিন টিভি। আর টিভির সূত্রে উত্তমকুমার। একই বাড়িতে তখন উত্তমের দুই প্রণয়ী— আমি আর ঠাম্মা। এমনই সেই প্রেম, বাবার ধমক, চোখরাঙানি এমনকি প্রহার সত্ত্বেও উত্তম-ঘোর কাটাতে পারিনি কিছুতেই। ক্লাস ফোর পর্যন্ত, প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়, সাড়ে দশটায় ছুটির পর, এগারোটার মধ্যে বাড়ি। কারণ একটাই, সাড়ে এগারোটা থেকে ডিডি বাংলায় উত্তমকুমারের সিনেমা। আনন্দবাজারের দ্বিতীয় পাতায় দেখে নিয়েছি আগেই। কখনও ইটিভি-তে, দুপুর দেড়টা থেকে। অগ্নিপরীক্ষা, রাইকমল, শাপমোচন, কুহক, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন। সপ্তপদী, হারানো সুর, ঝিন্দের বন্দী। উত্তমকুমারকে নকল করছি একান্তে। হাঁ করে গিলছি প্রতিটা আচরণ। মনে-মনে উত্তমকুমার হয়ে উঠছি নিজেই।

আর এভাবেই কখন জানি সর্বনাশ করেছি নিজের। খানিক বড়ো হয়ে বুঝেছি তা। স্বভাবে, কথা বলার ধরনে এমনকি তাকানোতেও ছাপ ফেলেছেন উত্তম। একুশ শতাব্দীতে আমার আচরণে পঞ্চাশের দশক। বন্ধুরা বলছে, অতীতে বাঁচি নাকি। বলছে, আজকের দিনে ওসব উত্তম-টুত্তম চলে না। অপ্রস্তুত হচ্ছি স্কুল-কলেজে। জীবনে। ‘অগ্নিপরীক্ষা’য় সুচিত্রা যখন ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ গাইছেন— নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ অথচ সংযত উত্তম— ব্যক্তিজীবনেও কখন ওই দূরত্বকেই ধ্রুব মেনে বসছি আমি। ‘হারানো সুর’-এ ‘তুমি যে আমার’ গানের সময় সুচিত্রার দিকে চুপ করে তাকিয়ে শুয়ে থাকা উত্তম। কিংবা ‘ইন্দ্রাণী’তে উত্তম নিজেই গাইছেন ‘সূর্য ডোবার পালা’, শুয়ে শুয়েই। হাসি আর গান মেশানো ওই আচরণ থেকে মুক্তি পাচ্ছি না কিছুতেই। থমকে যাচ্ছি পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। ব্যথায়-বিরহেও সংযত আচরণ। মেনে নেওয়া। নির্জন কোনো কিনারে বসে একা-একা গান। এমনটা না হলেই পারত। কিন্তু এই যে সিনেমার ছাঁচে গড়ে উঠল জীবনটা, অদ্ভুত এক মূল্যবোধ ও না-পাওয়ার মিশেল, তার কী হবে? শৈশব-কৈশোরকে দোষ দেব, দোষ দেব উত্তমকে— দিনের শেষে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব আনতে চেয়েও পরাজিত হব বারবার।

কী হত, যদি ‘শিল্পী’ না দেখতাম ছোটোবেলায়? প্রেমিকার মূর্তি খোদাই করে, মূর্তির পায়েই ঢলে পড়ে যাওয়া? যদি না শুনতাম বোষ্টম আখড়ায় সুচিত্রার প্রতি ‘কমল’ ডাক? ওই উচ্চারণ? কিংবা কোনো দাওয়ায় বসে উদাস গান— ‘এই জীবনে কি আলো জ্বেলে দেবে না/তব আঁখির প্রদীপ যেন নেভে না?’ একটা জিনিস টের পেয়েছি, ভালোমানুষিতে উত্তমের জুড়ি নেই। আদর্শতাড়িত এক পুরুষ। কথোপকথনের সময়ও, চোখ সামনের মানুষটিতেই আটকে থাকে না। দিগন্ত তখন তাঁর গণ্ডি। ব্যক্তি নয়, সমগ্র-কে বলছেন যেন উত্তম। ফলে, শুধু চিত্রনাট্যের ডায়লগ নয়, তার থেকেও বেশি কিছু— হয়তো জীবনদর্শনই হয়ে উঠছে তাঁর কথা। আনমনা হতে-হতে, হঠাৎ চোখ তুলে হাসি দিয়ে ভুলিয়ে দেওয়া সবকিছু। যেমনটি দেখেছিলাম ‘তারে বলে দিও’ গাওয়ার সময়। মুহূর্তে জগৎবিচ্ছিন্ন, আবার মুহূর্তেই বাস্তবে ফিরে আসা— যদি ব্যর্থ অনুকরণই করি, ক্ষতি কী!

ক্ষতি অন্যত্র। আত্মজীবনীতে যেমন সব হুবহু লেখা যায় না, উত্তমকুমার-কে নিয়ে লেখার সময় আমিও মুখোমুখি হচ্ছি সেই সমস্যার। তাঁকে নিয়ে কখনও লিখব ভাবিনি, কেননা যিনি শৈশব থেকে মিশে আছেন, বাড়ির সদস্যের মতো— সবসময় হয়তো মনোযোগ পান না, কিন্তু মোক্ষম সময়ে বোঝা যায়, না থাকলে কী শূন্যতা— উত্তমও আমার কাছে তাই-ই। মাঝে-মাঝে ভাবি, কী হত, যদি তাঁর সঙ্গে পরিচয় না হত? অন্যরকম এক মানুষ হতাম, নিশ্চিত। ‘সূর্যতোরণ’ থেকে নেওয়া হত না কমিউনিজমের পাঠ। ‘অবাক পৃথিবী’ থেকে ফুরফুরে মেজাজ। ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ থেকে রাজকীয় সততা এবং ‘দেয়া নেয়া’ থেকে ব্যক্তিত্ব। তিলে তিলে তাঁকে ধারণ করেছি, জারিত করেছি এবং হয়ে উঠেছি নিজেই নিজের উত্তমকুমার। অনেক না-পাওয়া, হারানো, ব্যর্থতার পরেও মনের জোর— গুরু কিন্তু পেরেছিলেন!

আর, তিনি পেরেছিলেন বলেই আমি আজ আমি। ভালো হলেও আমি, খারাপ হলেও। বৃষ্টিভেজা পথের মতো। শুধু, আমার কোনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নেই। ফলে, পথ চেয়ে বসে থাকলেও, কোনো সুচিত্রা সেন এসে শাপমোচন করবেন না আমার। করবেন না, জানি...


(সোমনাথ শর্মা সম্পাদিত 'উত্তম নিশ্চিন্তে চলে' সংকলনে প্রকাশিত, প্রকাশক - আচমন, ২০২১)



Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation