রুনু মল্লিকের বইমেলা
৮টা ১৫। বইমেলার মাঠ প্রায় ফাঁকা। দোকানপাট বেশিরভাগই বন্ধ, কমে এসেছে লোকজনও। মাঠের ভেতর দিয়েই, হনহন করে হেঁটে যাচ্ছি ৬ নং গেট থেকে ৫-এর দিকে। কিছুটা অন্যমনস্ক। হঠাৎ কানে এল এক নারীকণ্ঠ। মৃদুস্বর। আমাকে দেখেই যেন সজীব হয়ে উঠল সেই গলা। 'কবিতা, গল্প - মাত্র পাঁচ টাকায়।'
এড়িয়েই গিয়েছিলাম। আড়চোখে যতটুকু দেখেছি, শীর্ণ চেহারার এক প্রৌঢ়া। কী মনে হতে, পিছিয়ে এলাম। পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে নিলাম 'কবিতা' ও 'গল্প'। পাঁচ টাকা কীই বা আর! একটা ছোট্টো কয়েনের বিনিময়ে প্রৌঢ়ার মুখে মৃদু হাসি। আমার হাতে তাঁর 'বই'।
বই-ই বটে! বাড়ি ফিরে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। চার পাতা, চারটি লেখা। তিনটি কবিতা, একটি গল্প। কাগজে হাতে লিখে, তারপর জেরক্স করা। সেই জেরক্সই ভাঁজ করে হয়ে উঠেছে বই।
মিথ্যে বলব না, লেখার মান আহামরি কিছু নয়। বলা চলে, খুবই সাধারণ। কিন্তু প্রৌঢ়ার এই লড়াই, উপার্জনের এই ইচ্ছা, কবিতার বিনিময়ে - বিস্মিত করেছিল। বিস্ময় কি শুধু ভালো লেখাতেই জাগে? এইসব লড়াইয়ে নয়?
কবির নাম রুনু মল্লিক। ওই 'বই'-এরই এককোণে লেখা ছিল নাম ও ফোন নম্বর। বাড়ি ফিরে, ফোন করে বসলাম। বারতিনেক পরে ধরলেন। সেই মৃদুস্বর। 'বলুন ভাই।' জানালাম, কোথা থেকে পেয়েছি নম্বর। সঙ্গে জিজ্ঞাসা, কোথায় থাকেন তিনি। উত্তর দিলেন, 'নাকতলা।' সেই সুদূর দক্ষিণ থেকে বইমেলায় আসছেন এই 'বই' বিক্রির জন্য! বয়স ৬৩। আমাদের পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য প্রকাশক-সম্পাদকরা তাঁদের এই কমরেডের খবর রাখেন কি?
কেন জানি ভেবে বসেছিলাম, নেহাত পেটের দায়েই বইমেলায় নিজের বই এভাবে বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁকে। এই ভাবনার কারণ অবশ্যই পারিপার্শ্বিকতা। সেইসঙ্গে, তাঁর লেখা গল্পের শেষ লাইনটাও - 'ঘামঝরা খাটুনি, মাত্র কটা পয়সায় সংসার চলে না। তবুও তাকে ঘাম ঝরাতে হয়, ছোট্ট মা-বাপ মরা নাতির জীবন রক্ষার্থে।' গল্পের আড়ালে নিজের কথাই কি লিখলেন রুনু মল্লিক?
অত্যন্ত কুণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কি শুধুই লেখেন?' জবাব দিলেন - 'শুধু লিখে কি আর হয় ভাই! আরও অনেককিছুই করতে হয়।' আর-কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কবিকে তাঁর স্ব-পরিচয়ের সম্মান দিয়েই প্রসঙ্গ থামিয়েছি। মেলায় আবার দেখা হয়ে যাবে - এমন এক চুক্তিতে কথোপকথনের ইতি।
লিটল ম্যাগাজিন কিংবা প্রকাশনাকে কেন্দ্র করে অনেকের দাঁতচাপা লড়াই দেখেছি আমরা। তা নিয়ে গর্বেরও শেষ নেই। সেই তালিকাতেই যোগ হল আরেকটি নাম, রুনু মল্লিক। বইমেলায় দেখা পেলে, আপনারাও না-হয় কিনেই নিলেন তাঁর ছোট্ট বইটি! লেখা না-হোক, তাঁর এই লড়াইকে সংগ্রহে তো রাখাই যায়!
বইমেলা একা আমাদের নয়, ওঁরও। বরং, ওঁর প্রয়োজন ও দাবি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। মেলার শেষে, 'অত কোটি টাকার বিক্রি হল' - গিল্ডের এই হিসেবে রুনু মল্লিকের সামান্য দু-একশো টাকাও থাকবে নিশ্চয়ই! থাকবে না?
(প্রসঙ্গ: কলকাতা বইমেলা ২০২২)