হে রাম!
বস্তুর কোনো ধর্ম হয় না। ধর্ম হয় ব্যবহারকারীর। ঠিক যেমন ধর্ম হয় না সঙ্গীতেরও। কোনো-কোনো গান প্রবলভাবে ধর্ম-সংক্রান্ত হলেও, আমার কাছে তা ধরা দিয়েছে সুর ও ধ্বনি-উচ্চারণের জন্য। প্রথমবার ‘মাওলা ইয়া সাল্লি ওয়া সাল্লাম’ শুনে গায়ে কাঁটা দেওয়ার অনুভূতি। আরবি বোঝার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু সুরের মধ্যে যে সমর্পণ, তা-ই সঙ্গীতকে সর্বজনীন করার পক্ষে যথেষ্ট। ঠিক এমনই অনুভূতি হয়েছিল ‘শুদ্ধ ব্রহ্ম পরাৎপর রাম’ শুনে।
‘উদ্বোধন কার্যালয়’ থেকে বহুদিন আগে একটা ছোট পুস্তিকা বেরিয়েছিল, গেরুয়া রঙের। নাম – ‘প্রার্থনা’। এখনও পাওয়া যায় কিনা জানি না। সেখানে রামকৃষ্ণ মিশনের অনেক বন্দনা, প্রার্থনাসঙ্গীত, স্তোত্র সংকলিত ছিল। সেই বইয়েই প্রথম পড়ি গানটি, লিরিক হিসেবে। পাতার পর পাতা জুড়ে রামবন্দনা, সঙ্গে তার বাংলা অনুবাদ। তার প্রায় কাছাকাছি সময়েই, কোনো ক্যাসেটে শুনেছিলাম গানটি। অদ্ভুত এক সুর। গাম্ভীর্যের সঙ্গে তাল লয় ছন্দ যেন একাকার হয়ে গিয়েছে সেই গানে।
তারপর পেরিয়ে গেছে প্রায় দশ বছর। মাঝেমধ্যেই মনে পড়ত গানটা, কিন্তু আর শোনা হয়নি। রামকৃষ্ণ মিশনের বহু অ্যালবামে খোঁজ করেও পাইনি। বছরখানেক আগে, হঠাৎই ইউটিউবে খুঁজে পেলাম। আবার সেই স্বর্গীয় অনুভূতি। ‘শেষতল্প সুখ নিদ্রিত রাম/ব্রহ্মাদ্যমর প্রার্থিত রাম’। পরে এ-ও জেনেছি, স্বামী ব্রহ্মানন্দ একবার ব্যাঙ্গালোরে এই সংকীর্তনটি শুনে সংকলন করে রামকৃষ্ণ মঠের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রচলন করেন।
ভাবতে বসলে অবাক লাগে। এই গানের কথা, যা পুরোপুরি রামাশ্রিত, অজস্রবার শোনার পরেও কিন্তু টানেনি আমায়। রাম মনে থেকে গেছেন অনুপ্রাস, সংস্কৃত ঝংকার ও গম্ভীর সুরের জন্য। ধর্মের প্রয়োজন কী, যদি সুর নিজেই ধর্ম হয়ে ওঠে? নাম-রামায়ণের পাশেই যদি ‘মাওলা ইয়া সাল্লি’ শুনি, সুরের চলন ছাড়া ফারাক করব কীসেয়? বড়জোর সংস্কৃত গানের অনেক শব্দই পরিচিত। কিন্তু আহ্বানের যে ভাষা, তা সর্বজনীন। হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ করে না সে।
ছোটো থেকেই, মোটামুটি একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে প্রচলিত পূজা ও আচার-আচরণ খুব কাছ থেকে দেখেছি। ‘ভগবান রাম’ আমাদের খুব কাছের ছিলেন না কোনোদিনই। এমনকি, পুজোর সময় ‘এতে গন্ধপুষ্পে’ বলে যে বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য দেবদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল-বেলপাতা নিবেদন করা হয়, সেই তালিকায় রাম কই! রাম-কে বাঙালি সচরাচর রামায়ণের মধ্যেই দেখতে ভালোবেসেছে। বাঙালি ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা থেকেই রামায়ণের কাহিনি জানে। রামকে ভগবান হিসেবে দেখার নিয়মিত অভ্যাস তাদের ছিল না কোনোদিনই। আছেন, আছেন – এটুকুই রামের অস্তিত্ব। বহুকাল আগে জয়দেব দশাবতার স্তোত্রে লিখে গিয়েছিলেন – ‘কেশবধৃত রামশরীর /জয় জগদীশ হরে।’ গীতা দত্তের কণ্ঠে সেই স্তোত্রই আমার কাছে রাম। কিংবা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন গেয়ে ওঠেন – ‘রাম রাঘব রাম রাঘব রাম রাঘব রক্ষমাম', রাম জীবিত হয়ে ওঠেন আমার কাছে। মনে হয়, হ্যাঁ, এখানে আশ্রয় পাওয়া যায়। শান্ত, শীতল আশ্রয়। সেখান থেকে কবে তরোয়াল উঁচিয়ে হুঙ্কার দেওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে গেলেন রাম?
এই আশ্রয় তো আশৈশব দিয়েই এসেছেন তিনি! ভূতের ভয় পেলে তাঁর নাম নেওয়া, কিংবা ছড়া কাটা – ‘ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি / রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে, করবে আমার কী’, এই সাহসের আরেক নাম রাম। সঙ্গে অপূর্ব এক বিশ্বাস – তাঁর নাম নিলে ভূতও পালাবে। সেখানেই যখন থেমে যাওয়া যেত, টেনেহিঁচড়ে অপরিচয়ের গণ্ডিতে টেনে আনার দরকার কী!
অথচ সেটাই হচ্ছে আজ। সারা ভারতের এই হুল্লোড়ে গা ভাসিয়েছেন বাঙালিরাও। রামনাম এখন আর আশ্রয়প্রার্থনা নয়, হুঙ্কার। এঁরা কোনোদিন ‘সীতার্পিতবর মালিক রাম’-কে চেনেননি। জানেন না ‘রক্ষমাম’-এর চাওয়া। শুধু ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে রাজত্ব করতে চান তাঁরা। কোথাও দলিতের ওপর আক্রমণ, কোথাও মুসলমান-কে পিটিয়ে মারা। তোমাকে বলতেই হবে। না বললে, ভারতে থাকার যোগ্য নও তুমি। কেন? আমি যদি দক্ষিণা কালীর উপাসক হই, কুলদেবী ছাড়া আর কেউ যদি আমার আরাধ্য না হন, তুমি কে হে আমায় জোর করার? কাউকে যদি বিশ্বাস না-ই করি, তাতেই বা তুমি কে আমাকে দেখিয়ে দেওয়ার? আমার আরাধ্য কে হবেন, রাম না মহম্মদ, তা আমার ব্যাপার। রামের নামে চাপিয়ে দেওয়া এই পরাধীনতা বাঙালি গিলছে। আফিমের মতো। অথচ এই জাতির বাহ্যিক রীতির ত্রিসীমানাতেও ছিল না এসব। ঠাকুরদালানে, চণ্ডীমণ্ডপে কথকঠাকুরের মুখে রামায়ণ শুনে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফেরা সরল বাঙালি গৃহবধূ আজ কেন হনুমান চালিশা-য় মজলেন?
আমাদের এই মফঃস্বলে মাত্র দুটি হনুমান মন্দির দেখেছি ছোট থেকে। আমরা ‘বজরংবলী’ বলতে অভ্যস্ত নই। হনুমানকে হনুমান বলাই আমাদের সংস্কৃতি। যে-দুটি হনুমান মন্দির ছিল, তা অবাঙালি মহল্লায়। বাঙালিরা যাতায়াতের পথে প্রণাম ঠুকতেন, বড়জোর দু-এক টাকা দক্ষিণা। আজ সেখানে তিলক কেটে সার দিয়ে বসে পড়েন সকলে। এখানে-সেখানে গজিয়ে উঠছে ঝাঁ-চকচকে মন্দির। ভেতরে কোথাও হনুমানের মূর্তি, কোথাও আবার বিকট গেরুয়া রঙের পাথর। সবচেয়ে চমক লেগেছিল আড়িয়াদহের শতাব্দীপ্রাচীন মধু রায়ের ঘাটে গিয়ে। কালীমন্দিরের পাশেই, একটা বটগাছের গোড়া বাঁধানো হয়েছে মহা আড়ম্বরে। সেখানে সগর্বে বিরাজ করছেন কর্পোরেট বজরংবলী। এখনকার প্রজন্ম এই পরিবেশেই বড় হচ্ছে। আজ থেকে কুড়ি বছর বাদে আমাদের বয়সে এসে পৌঁছোবে যে প্রজন্ম, তাদের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির অত্যাবশ্যক অঙ্গ রামনবমী, গণেশ চতুর্থী। সত্যনারায়ণের পাঁচালি কী, তারা জানবে না। জানবে না, শনির পাঁচালি বলে একটা জিনিস পড়া হত প্রতি শনিবারে। বদলে হনুমান চালিশার জয়গান গাইবে। প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
গুলিবিদ্ধ মহাত্মা গান্ধী পরম বিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন, ‘হে রাম!’ সেটাই তাঁর উচ্চারিত শেষ বাক্য। বিশ্বাস করতে পারেননি, তাঁরই এক দেশবাসী তাঁকে হত্যা করতে পারে। গান্ধীজির সেই উচ্চারণে মিশে ছিল দীর্ঘশ্বাসও। আজ রাম যদি নিজেই সার্বিকভাবে আফশোসের কারণ হয়ে ওঠেন, একবার ভাবুন তো, ‘হে রাম’-এর পরিধি কত বিস্তৃত হয়ে যায়! ‘জয় শ্রীরাম’-এর বিপরীতে আমাদের উচ্চারণ হোক সেই আফশোসই। ভেতরের রামকে বাইরে জোর করে টেনে আনার এই দিনে, বাঙালি আর কীই বা বলতে পারে!
প্রত্যেক বছরই শ্রাবণ মাসে কাঁধে বাঁক নিয়ে একদল লোক যখন তারকেশ্বরে যায়, পায়ে হেঁটে, তাদের গলায় শুনেছি ‘ব্যোম ব্যোম’ ধ্বনি। সম্প্রতি ব্যোম-ধ্বনি ছাপিয়ে উঠল ‘জয় শ্রীরাম।’ ট্রেনে ওঠার সময়, বাস থেকে নামার সময়, মিছিলে হাঁটতে গিয়ে সর্বত্র সোচ্চার হয়ে উঠছে এই রাম-হুঙ্কার। অন্যদিকে, হারিয়ে যাচ্ছে বাড়ির গোড়ায় এসে পেলব গলার কড়া নাড়া – ‘বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগি, মহাদেব!’ হারিয়ে যাচ্ছে বৈষ্ণবদাদুর করতাল বাজিয়ে গান করা। তাঁর রসকলির মধ্যে স্নেহ ছিল, মুখে ছিল ‘হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।’ তা কিন্তু অস্বাভাবিক লাগেনি কখনোই। কেন-না তা ছিল বাংলার সনাতন স্রোত। জোর করে রামকে আরও ওপরে তুলতে গিয়ে, কোপ মারা হচ্ছে স্বাভাবিকতার পায়েই। আর মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রামও বেশ আলো নিয়ে যাচ্ছেন। বাঙালিরাও ক্রমাগত প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে অবাঙালিদের। একটা কথা বলতে দ্বিধা নেই, এসবের বাড়বাড়ন্ত ২০১৪-র পরেই। হঠাৎ হিন্দুত্ব দেখানোর জিগির উঠল বাংলায়। নিজের পরিচয় ও সংস্কৃতি হারিয়ে, আগে হিন্দুত্ব?
রামের সুমতি হোক!
(আঙ্গিক পত্রিকার 'সাংস্কৃতিক ক্ষয় এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংখ্যা'য় প্রকাশিত, ২০১৯)
