অবাঙ্মনসগোচর ও শকাব্দ
বঙ্গাব্দের পাশাপাশি, অন্য এক সালগণনা নিয়ে একটা গল্প বলি।
সঙ্গে যে ছবিটা রয়েছে, তা ‘অবাঙ্মনসগোচর’ বইয়ের ব্যাক কভারের। চারটি পঙক্তি লেখা। ভাষাভঙ্গি যে আজকের নয়, বলাই বাহুল্য। বস্তুত এই চারটি লাইন আসলে এক ধাঁধা, যা শিখেছিলাম প্রাগাধুনিক যুগের(চলতি ভাষায় যাকে ‘মধ্যযুগ’ বলি) বিভিন্ন বাংলা কাব্য থেকে।
বহুকাল ধরেই বাংলার ‘নিজস্ব’ সন হিসেবে প্রচলিত ছিল শকাব্দ। এমনকী, বঙ্গাব্দ প্রচলনের পরেও বিভিন্ন বাংলা পুথিতে শকাব্দ দিয়েই জানানো হত রচনাকাল(হিজরি, মল্লাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি তো ছিলই)। কোথাও আবার শকাব্দ ও বঙ্গাব্দ—উভয়েরই উল্লেখ থাকত। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত শকাব্দের ব্যবহার ছিল প্রায় অপরিহার্য, এ-কথা বলাই যায়।
হয়েছে কী, খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮ বিয়োগ করলে সাধারণত শকাব্দ মেলে। তর্কযোগ্য একটি মত অনুসারে, সম্রাট কণিষ্কের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে শকাব্দ প্রচলিত হয়, যদিও তা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইংরাজি ৭৮ খ্রিস্টাব্দ = ১ শকাব্দ। এখন, অনেক পুথির পুষ্পিকাতেই উল্লেখ থাকত শকাব্দের। বাঙালি কবিরা আবার এক কাঠি উপরে। কখনো-কখনো সাধারণ সংখ্যা দিয়ে শকাব্দ লেখার বদলে, বিভিন্ন ধাঁধার আশ্রয় নিতেন তাঁরা।
কীরকম সেই ধাঁধা? ধরা যাক ১৭৪০ শকাব্দটি। প্রতিটি সংখ্যার জন্য আলাদা-আলাদা শব্দ বাছলে কীরকম দাঁড়াবে? ‘ইন্দু সিন্ধু বেদ শূন্য’। ইন্দু = ১, সিন্ধু = ৭, বেদ = ৪ ও শূন্য = ০। বিকল্প শব্দও রয়েছে অনেক। ১৭৪০-টিকে লেখা যেত ‘ধাতা ঋষি যুগ নভঃ’ হিসেবেও। অনেকক্ষেত্রে আবার অঙ্কস্য বামাগতি সূত্রে সটান উল্টে লেখা হত সনটি— ‘শূন্য বেদ সিন্ধু ইন্দু’। সেক্ষেত্রে ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে পড়ে রহস্যভেদ করতে হবে। বিজয় গুপ্ত তাঁর পদ্মাপুরাণে লিখেছিলেন ‘ঋতু শশী বেদ শশী পরিমিত শক’, এর থেকে যে সংখ্যাগুলি বেরোয়, তা হল— ৬, ১, ৪, ১। ডানদিক থেকে বাঁদিকে পড়লে, ১৪১৬ শকাব্দ(১৪৯৪ খ্রি.)।
এবার, ‘অবাঙ্মনসগোচর’ বইটির শুরু ও প্রকাশের সাল জানাতে, প্রাচীন সেই পদ্ধতিতেই এই চার লাইন ফেঁদেছিলাম—
যুগে যুগে গ্রহ চন্দ্র শকের বিহিত।
শূন্যচন্দ্র মাসে গ্রন্থ হৈল প্রকাশিত।।
শূন্য যুগে গ্রহ চন্দ্র জন্মকথা কয়।
কবিজন্মে দ্বিজপুণ্য জানিহ নিশ্চয়।।
যুগ চারটি, গ্রহ নয়টি ও চন্দ্র একটি। অর্থাৎ ‘যুগে যুগে গ্রহ চন্দ্র’ = ৪ ৪ ৯ ১। এবার, অঙ্কস্য বামাগতি সূত্রে উল্টে পড়লে, পাচ্ছি ১৯৪৪ শকাব্দ, যা ইংরাজি ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ(এক্ষেত্রে ৭৯ যোগ হয়েছে, কেন, তা পরে বলছি)। ‘শূন্য চন্দ্র মাস’ = ০ ১ = ১০, অর্থাৎ মাঘ মাস, যা ইংরাজিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে, ১৯৪৪ শকাব্দের মাঘ মাসে।
এবার, ‘শূন্য যুগে গ্রহ চন্দ্র জন্মকথা কয়’ = ০ ৪ ৯ ১ = ১৯৪০ শকাব্দ অর্থাৎ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। বইয়ের সবচেয়ে পুরোনো কবিতাটি সেই সালেই লেখা, ফলে সে-হদিশই রয়েছে এতে। চতুর্থ লাইনটি জেনারেল, কনক্লুসিভ।
স্বাধীনতার পর, ভারতের জাতীয় বর্ষপঞ্জি হিসেবে ঘোষিত হয় শকাব্দ। ২২ মার্চ সেখানে পয়লা চৈত্র। বস্তুত, চৈত্রই শকাব্দের প্রথম মাস, বৈশাখ দ্বিতীয়। শেষ মাস ফাল্গুন। শকাব্দের মাসগুলি মিলে যায় বঙ্গাব্দের মাসের সঙ্গে। এখন, উত্তর ভারতে চৈত্র থেকে শকাব্দগণনা শুরু হলেও, বাঙালি বরাবর পয়লা বৈশাখকেই শকাব্দের শুরু হিসেবে ধরেছে, অর্থাৎ, শকাব্দ ও বঙ্গাব্দের শুরু ও শেষ বাঙালির কাছে একই সময়ে।
ইংরাজি সাল থেকে শকাব্দ ৭৮ বা ৭৯ বছর পিছিয়ে। বৈশাখ থেকে পৌষের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায় ৭৮ বিয়োগ করলে, আর পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র পর্যন্ত শকাব্দ মেলে ৭৯ বাদ দিলে। সেই হিসেবে, অবাঙ্মনসগোচর-এর প্রকাশকাল ২০২৩-এর জানুয়ারি দাঁড়িয়েছে ১৯৪৪ শকাব্দের মাঘে।
বইয়ের ব্যাক কভারে কেন এই ধাঁধার আশ্রয় নিয়েছিলাম? এ আসলে প্রাচীন এক পদ্ধতির চর্চা করা। নিজের অনুশীলন তো হলই, সেই সঙ্গে ফিরিয়ে আনা গেল বাঙালির সালজ্ঞাপনের প্রাচীন ভঙ্গিটিকেও। বঙ্গাব্দেরও আগে যার প্রচলন, আরেকবার তার স্মৃতিচারণ করলে ক্ষতি কী!
সঙ্গে যে ছবিটা রয়েছে, তা ‘অবাঙ্মনসগোচর’ বইয়ের ব্যাক কভারের। চারটি পঙক্তি লেখা। ভাষাভঙ্গি যে আজকের নয়, বলাই বাহুল্য। বস্তুত এই চারটি লাইন আসলে এক ধাঁধা, যা শিখেছিলাম প্রাগাধুনিক যুগের(চলতি ভাষায় যাকে ‘মধ্যযুগ’ বলি) বিভিন্ন বাংলা কাব্য থেকে।
বহুকাল ধরেই বাংলার ‘নিজস্ব’ সন হিসেবে প্রচলিত ছিল শকাব্দ। এমনকী, বঙ্গাব্দ প্রচলনের পরেও বিভিন্ন বাংলা পুথিতে শকাব্দ দিয়েই জানানো হত রচনাকাল(হিজরি, মল্লাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি তো ছিলই)। কোথাও আবার শকাব্দ ও বঙ্গাব্দ—উভয়েরই উল্লেখ থাকত। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত শকাব্দের ব্যবহার ছিল প্রায় অপরিহার্য, এ-কথা বলাই যায়।
হয়েছে কী, খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮ বিয়োগ করলে সাধারণত শকাব্দ মেলে। তর্কযোগ্য একটি মত অনুসারে, সম্রাট কণিষ্কের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে শকাব্দ প্রচলিত হয়, যদিও তা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইংরাজি ৭৮ খ্রিস্টাব্দ = ১ শকাব্দ। এখন, অনেক পুথির পুষ্পিকাতেই উল্লেখ থাকত শকাব্দের। বাঙালি কবিরা আবার এক কাঠি উপরে। কখনো-কখনো সাধারণ সংখ্যা দিয়ে শকাব্দ লেখার বদলে, বিভিন্ন ধাঁধার আশ্রয় নিতেন তাঁরা।
কীরকম সেই ধাঁধা? ধরা যাক ১৭৪০ শকাব্দটি। প্রতিটি সংখ্যার জন্য আলাদা-আলাদা শব্দ বাছলে কীরকম দাঁড়াবে? ‘ইন্দু সিন্ধু বেদ শূন্য’। ইন্দু = ১, সিন্ধু = ৭, বেদ = ৪ ও শূন্য = ০। বিকল্প শব্দও রয়েছে অনেক। ১৭৪০-টিকে লেখা যেত ‘ধাতা ঋষি যুগ নভঃ’ হিসেবেও। অনেকক্ষেত্রে আবার অঙ্কস্য বামাগতি সূত্রে সটান উল্টে লেখা হত সনটি— ‘শূন্য বেদ সিন্ধু ইন্দু’। সেক্ষেত্রে ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে পড়ে রহস্যভেদ করতে হবে। বিজয় গুপ্ত তাঁর পদ্মাপুরাণে লিখেছিলেন ‘ঋতু শশী বেদ শশী পরিমিত শক’, এর থেকে যে সংখ্যাগুলি বেরোয়, তা হল— ৬, ১, ৪, ১। ডানদিক থেকে বাঁদিকে পড়লে, ১৪১৬ শকাব্দ(১৪৯৪ খ্রি.)।
এবার, ‘অবাঙ্মনসগোচর’ বইটির শুরু ও প্রকাশের সাল জানাতে, প্রাচীন সেই পদ্ধতিতেই এই চার লাইন ফেঁদেছিলাম—
যুগে যুগে গ্রহ চন্দ্র শকের বিহিত।
শূন্যচন্দ্র মাসে গ্রন্থ হৈল প্রকাশিত।।
শূন্য যুগে গ্রহ চন্দ্র জন্মকথা কয়।
কবিজন্মে দ্বিজপুণ্য জানিহ নিশ্চয়।।
যুগ চারটি, গ্রহ নয়টি ও চন্দ্র একটি। অর্থাৎ ‘যুগে যুগে গ্রহ চন্দ্র’ = ৪ ৪ ৯ ১। এবার, অঙ্কস্য বামাগতি সূত্রে উল্টে পড়লে, পাচ্ছি ১৯৪৪ শকাব্দ, যা ইংরাজি ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ(এক্ষেত্রে ৭৯ যোগ হয়েছে, কেন, তা পরে বলছি)। ‘শূন্য চন্দ্র মাস’ = ০ ১ = ১০, অর্থাৎ মাঘ মাস, যা ইংরাজিতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে, ১৯৪৪ শকাব্দের মাঘ মাসে।
এবার, ‘শূন্য যুগে গ্রহ চন্দ্র জন্মকথা কয়’ = ০ ৪ ৯ ১ = ১৯৪০ শকাব্দ অর্থাৎ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। বইয়ের সবচেয়ে পুরোনো কবিতাটি সেই সালেই লেখা, ফলে সে-হদিশই রয়েছে এতে। চতুর্থ লাইনটি জেনারেল, কনক্লুসিভ।
স্বাধীনতার পর, ভারতের জাতীয় বর্ষপঞ্জি হিসেবে ঘোষিত হয় শকাব্দ। ২২ মার্চ সেখানে পয়লা চৈত্র। বস্তুত, চৈত্রই শকাব্দের প্রথম মাস, বৈশাখ দ্বিতীয়। শেষ মাস ফাল্গুন। শকাব্দের মাসগুলি মিলে যায় বঙ্গাব্দের মাসের সঙ্গে। এখন, উত্তর ভারতে চৈত্র থেকে শকাব্দগণনা শুরু হলেও, বাঙালি বরাবর পয়লা বৈশাখকেই শকাব্দের শুরু হিসেবে ধরেছে, অর্থাৎ, শকাব্দ ও বঙ্গাব্দের শুরু ও শেষ বাঙালির কাছে একই সময়ে।
ইংরাজি সাল থেকে শকাব্দ ৭৮ বা ৭৯ বছর পিছিয়ে। বৈশাখ থেকে পৌষের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায় ৭৮ বিয়োগ করলে, আর পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র পর্যন্ত শকাব্দ মেলে ৭৯ বাদ দিলে। সেই হিসেবে, অবাঙ্মনসগোচর-এর প্রকাশকাল ২০২৩-এর জানুয়ারি দাঁড়িয়েছে ১৯৪৪ শকাব্দের মাঘে।
বইয়ের ব্যাক কভারে কেন এই ধাঁধার আশ্রয় নিয়েছিলাম? এ আসলে প্রাচীন এক পদ্ধতির চর্চা করা। নিজের অনুশীলন তো হলই, সেই সঙ্গে ফিরিয়ে আনা গেল বাঙালির সালজ্ঞাপনের প্রাচীন ভঙ্গিটিকেও। বঙ্গাব্দেরও আগে যার প্রচলন, আরেকবার তার স্মৃতিচারণ করলে ক্ষতি কী!
বই - অবাঙ্মনসগোচর
