বাংলাবাজার, কবিতা, ঈর্ষাবিশ্লেষণ ওরফে পঙ্কিলতা-চর্চা
(১)
বহু বছর আগের কথা। এক বান্ধবীকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলাম আমার একটি বই, সঙ্গে সমসাময়িক আরও কয়েকজনের কবিতার বই। অন্যের ভালো কবিতা পাঠককে পড়াতে আমার ঈর্ষাবোধ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কোনোদিনই। অথচ সেদিন কী যে হল! বান্ধবীটি আমার বইটি বাদ দিয়ে, বাকিদের বই সুন্দর করে সাজিয়ে, ছবি তুলে প্রকাশ্যে আনলেন। এবং, ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল আমার। উত্তর হিসেবে জন্ম নিল একটি কবিতাই—
‘বিখ্যাত কবিদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়েছি
তোমার বিছানা থেকে। আর যদি কোনোদিন দেখি,
রক্তারক্তি হবে। সমস্ত ছেঁদো কথা—
কীসের প্রতিভাবান! কে পূর্বসূরি!
আমার তুলনা তোকে করতে দেব না মুখপুড়ি’
কী প্রচণ্ড ক্রোধ ও অধিকারবোধ মিশে আছে এ-লেখায়, আজও টের পাই। অথচ কবিতা হিসেবে অত্যন্ত দুর্বল; নিছক মানসিক সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাই না এতে। লেখার সময়েও বোধহয় টের পেয়েছিলাম এ-খুঁত। সেহেতু নামকরণ ‘সাইকো’। আমি কি শিরোনামে নিজের হীন মানসিকতাকেই আড়াল করতে চাইছিলাম? আমার নিজেরই বন্ধুবান্ধব, সমসাময়িক কবিতা-লিখিয়েদের ঈর্ষা করছিলাম, তখনও-কাছের-হয়নি এমন এক নারীকে কেন্দ্র করে?
খানিক প্রসঙ্গান্তরে যাই। অপর কবির প্রতি কেন জন্মায় এই ঈর্ষাবোধ? পাঠক হিসেবে যে-ঈর্ষা, তা সুস্থ। কারোর লেখা পড়ে বিস্মিত হওয়ার, চমকে ওঠার, মনে-মনে নত হওয়ার ও ‘আমি যদি এমন লিখতে পারতাম’-গোছের অনুভূতিকে পবিত্র বলেই মনে করি। আমাকে তা মুগ্ধ করে, সমৃদ্ধও; আজীবন শিখতে-শিখতে এগিয়ে চলার এই পথে কোনো দোষ দেখতে পাই না।
তাহলে কোন ঈর্ষা আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে, ভেতরে-ভেতরে অস্থির করে তোলে? তা কবিতা-কেন্দ্রিক নয়, বরং কবিতার বাইরের অন্য-অন্য বিষয়। হতে পারে খ্যাতি ও পুরস্কার। হতে পারে নারী। আর-যাই হোক, কবিতা নয়।
আর, যদি লেখার মধ্যেই ঢুকে পড়ে ঈর্ষা, হিংসা ও ক্ষোভ? যদি কবিতাই ধারণ করে এই-এই অনুভূতিগুলি?