বেলঘরিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস


 প্রভাস সরকার আত্মহত্যা করেছিলেন। রোগে ভুগে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন সুকুমার ঘোষ।

চট করে নামদুটি হয়তো কেউ চিনবেন না। সত্তর বছর আগেই প্রয়াত এঁরা। আজ ঠাঁই নিয়েছেন পার্কের নামে। স্মৃতিতেও ধরার মতো তেমন কেউ নেই আর। কিন্তু কেন আত্মহত্যা করলেন প্রভাস? কী হয়েছিল সুকুমারের? 

এই প্রশ্নের উত্তর চাইলে অবশ্য উঁকি দিতে হবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে। 'বাম দুর্গ' কামারহাটি বিধানসভা। বেলঘরিয়া, আড়িয়াদহ, দক্ষিণেশ্বর ও কামারহাটি - এই চার জনপদ নিয়ে তৈরি। অবশ্য বাকি তিনটি এলাকার বহু আগেই বেলঘরিয়ায় প্রবেশ করেছিল কমিউনিজমের ধারা। সৌজন্যে রাজবন্দি বিপ্লবীরা। বেশিরভাগই কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জেলে গিয়ে দীক্ষিত হন বামপন্থায়। ১৯৩৮ সালে, ইংরেজ সরকার যখন একে একে রাজবন্দিদের মুক্তি দিচ্ছে ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে, একদল এলেন বেলঘরিয়ায়। থাকতে শুরু করলেন বিভিন্ন মেসে। সেই শুরু...

প্রভাস সরকার বেলঘরিয়ারই মানুষ। আইন অমান্য আন্দোলন করে জেলে যান। বছর ছয়েক পর ছাড়া পেয়ে, শুরু করেন সংগঠনের কাজ। মূলত ধানবাদে, কিন্তু যাতায়াত করতেন বেলঘরিয়াতেও। স্বাধীনতার পর, কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে, বিহারেই গ্রেপ্তার হন প্রভাস। তিন বছর পর ছাড়া পেয়ে ফিরে আসেন বেলঘরিয়ায়। এবং আত্মহত্যা করেন। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য জেল খেটেছিলেন, স্বাধীনতার পরেও সেই দেশ আবার জেলে পাঠাল তাঁকে - এই অপমান সহ্য করতে পারেননি প্রভাস।  

সিপিআইএমের জন্মের তখনও বহু দেরি। 'কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া'। চল্লিশের দশকে বেলঘরিয়ায় এক আবেগের নাম। ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে গণনাট্য সংঘও। শাখা খুলেছে বেলঘরিয়ায়। আসছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীরা। গণনাট্য সংঘ বেআইনি ঘোষিত হলে, সংগঠনের নাম বদলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বেলঘরিয়াবাসী। সেসব এক দিন ছিল বটে!

সেসব দিনেরই সৈনিক সুকুমার ঘোষ, নন্দগোপাল চট্টোপাধ্যায়, চতুর আলি, বিশু দাসরা। ২৫-২৬ বছর বয়সেই শ্রমিক আন্দোলনের নেতা হয়ে উঠেছিলেন সুকুমার। চাকরি করতেন একটি মিলে। শ্রমিকদের স্বার্থে লড়াই করে ছাঁটাই হয়েছেন। পরবর্তীতে গেছেন জেলেও। কারাবন্দি থাকাকালীনই ২৩ দিন অনশন। ফিরে এসে আবার শ্রমিক আন্দোলন।

না, রাজনীতির ময়দানে খুব উঁচুতে ওঠেননি। বড়োজোর ২৪ পরগণা জেলা কমিটির সভ্য। কিন্তু তাতে বেলঘরিয়ার সুকুমার ঘোষকে মাপা যায় না। শারীরিক অসুস্থতার জন্য হাজারিবাগে হাওয়াবদল করতে গিয়েছিলেন। সেখানেই মৃত্যু। বয়স তখন মাত্র ৩৫। হাজারিবাগ থেকে বেলঘরিয়ায় সুকুমারের চিতাভস্ম নিয়ে ফেরার বর্ণনা লিখে গেছেন তাঁরই এক কমরেড - 
'...ট্রেন বেলঘরিয়া স্টেশনের জনসমুদ্র ঠেলে এসে প্ল্যাটফর্ম স্পর্শ করল। শত শত অর্ধনমিত লাল পতাকার পাশে পাশে আকাশের দিকে উঁচু করা সহস্র সহস্র হাত।'

এইসব শতসহস্র মুষ্ঠিবদ্ধ হাতই বেলঘরিয়ায় কমিউনিজমকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীতে আসেন উদ্বাস্তু আন্দোলনের নেতারা। অন্য জমানায় প্রবেশ...

সিপিআই-এর সমান্তরালে কংগ্রেসি মুভমেন্টও চলত। সেই ইতিহাস কমবেশি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে। হিন্দু মহাসভার চিহ্নও ছিল না বেলঘরিয়ায়। তবে হ্যাঁ, গোঁড়া মানসিকতা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের রমরমা তো চিরকালই। কমিউনিস্ট পার্টিই সম্ভবত সে-চরিত্রের বদল ঘটায়। উদ্বাস্তু আগমনও অনেকটা দায়ী।

তথ্যসূত্র - 
বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে
তন্ময় ভট্টাচার্য
প্রকাশক - ধানসিড়ি




Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation