পুথি-পরিক্রমা
‘আমার সকল কর্ম নিত্যানন্দ-দ্বারে’—চুপ করে বসে আছি এই লাইনের কাছে। বইয়ে তো অনেকদিন আগেই পড়া, কিন্তু এই মুহূর্তে পুথির পাতা থেকে জ্বলজ্বল করছে আমার সামনে। এ-শিহরনের তুলনা হয় না! কিংবদন্তি-হয়ে-যাওয়া, ৪৭০ বছরের পুরোনো এক লাইন।
কী এই নিত্যানন্দ-দ্বার? পানিহাটিতে শ্রীচৈতন্য রাঘব পণ্ডিতকে বোঝাচ্ছেন, তিনি ও নিত্যানন্দ অভিন্ন। ‘আমার দ্বিতীয় নাই নিত্যানন্দ বহি।’ ‘আমার সকল কর্ম নিত্যানন্দ-দ্বারে’—অর্থাৎ, নিত্যানন্দের মাধ্যমেই প্রস্ফুটিত হয় চৈতন্যের সকল কর্ম ও লীলা। অপ্রাসঙ্গিক, তবুও বলি, এর এক দশকের মধ্যেই নিত্যানন্দ বসবাস করতে আসবেন খড়দহে, সংসারও পাতবেন ক্রমে।
এত সহজ ব্যাখ্যা হলে তো সমস্যাই ছিল না। বিষয় হল, সহজিয়ারা এই লাইনটিকে বড়ো আপন করে নিয়েছেন। দখলই করে নিয়েছেন বলা চলে। তাঁদের কথায়, ‘নিত্যানন্দ-দ্বার’ হল যোনিদেশ, যেখানে নিত্য আনন্দ বিরাজমান। শরীরী সাধন—মিলন ও সংযমের ক্রিয়াই যেখানে মুখ্য—সাধককে ঈশ্বরস্বাদ ওই দ্বারই দিতে পারে। চৈতন্যও, ‘আমার সকল কর্ম নিত্যানন্দ-দ্বারে’ বলতে পরোক্ষে নাকি সেই ইঙ্গিতই করেছেন। তিনিও যুগলসাধনে ব্রতী ছিলেন, শ্বাস নিয়ন্ত্রণে রেখে শরীরী-যোগই কৃষ্ণপ্রাপ্তির পথ—ইত্যাদি বহু ব্যাখ্যা-প্রতিব্যাখ্যার আবর্তন, এই একটি লাইন ঘিরে।
সেই দীর্ঘ ভাবনাচিন্তা ছেড়ে, পুথির পাতায় মন দিই। চৈতন্যভাগবতের যে অংশ নিয়ে আমার ঘাঁটাঘাঁটি, তার গা ঘেঁষেই রয়েছে এই লাইন। ফলে, চোখ পড়েই যায়। শিহরিত হই। বৃন্দাবন দাস 'চৈতন্যভাগবত' লেখার প্রায় ২৭০ বছর পর লিপিকর নকল করেছেন এই পুথি, আর তারও দুশো বছর পর কাজের খাতিরে তা ধরা দিচ্ছে আমার চোখে। ফলে, ডুবে আছি...