রাম দিয়েই রামকে চেনানো


 চিনতে হলে এই রামকেও চিনুন, যিনি ষড়ভুজ গৌরাঙ্গে স্থিত। দেখুন সঙ্গের ছবিটি। ওপরের দুই হাত রামের প্রতীক, মধ্যের হাতদুটি কৃষ্ণের। বাদবাকি গৌরাঙ্গ-অবয়ব তো রয়েইছে! বঙ্গদেশে রামোপাসনার যেটুকু প্রবাহ এসেছিল, তার সিংহভাগ কৃতিত্বই কিন্তু নিমাই ওরফে গৌরাঙ্গ ওরফে চৈতন্যের।

চৈতন্য-প্রভাবে ভক্তিবাদ যখন বাংলার সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ল, বৈষ্ণবদের মুখ্য উপাস্য হয়ে উঠলেন কৃষ্ণ। রাম, খানিক একটেরে হয়েও, পোক্ত জায়গা করে নিলেন ভক্তিবাদের সৌজন্যেই। বাংলায় তিনি যোদ্ধা হয়ে আসেননি, তাঁর আগমনে উগ্রতার লেশমাত্র নেই। তিনি কমনীয়, বাঙালির ঘরের ছেলে, কৃষ্ণের মতোই। বঙ্গসন্তান নিমাই-এর মধ্যেও তাঁর আবির্ভাব সেই পেলবতাকেই তুলে ধরে। 

আবার ফিরে যাই ছবিটির প্রসঙ্গে। ষড়ভুজ গৌরাঙ্গ। বৃন্দাবনদাস চৈতন্যভাগবতে লিখেছেন, গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দকে ষড়ভুজ-দর্শন দিয়েছেন, কিন্তু তা শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম-শ্রীহল-মুষলধারী। এই ছবির ষড়ভুজ গৌরাঙ্গে কিন্তু সেই রূপ নেই। ওপরের এক হাতে ধনুক আছে বটে, অপর হাতে তীর নেই—অর্থাৎ, হিংসা নৈব নৈব চ। মাঝের হাতদুটি তো বংশীবাদনেই ব্যস্ত। আর অবশিষ্ট দুটি হাত আজানুলম্বিত, গৌরাঙ্গের নিজস্ব। তাঁরই মধ্যে রাম ও কৃষ্ণের এই অধিষ্ঠান—না-জানি কোন শিল্পী এঁকেছিলেন এটি!

শিল্পী অজানা, তবে ছবিটির অবস্থান অজানা নয়। রয়েছে হুগলির গুপ্তিপাড়ায়, বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরের দেওয়ালে। বিলিতি শিল্প-ব্যাকরণ যাকে 'ফ্রেস্কো' বলে, এটি তা-ই। দুশো বছরেরও অধিক পুরোনো।

আজকের দিনটিকে এড়ানোর উপায় নেই। ভবিষ্যত এই দিন ও ঘটনা-পরম্পরার নিরপেক্ষ বিচার করবেই। আজ, চুপ থাকার বিকল্প উপায়, বৈচিত্র্যময় অন্যান্য ভাষ্য তুলে ধরা। বারবার, বারবার। রাম দিয়েই রামকে চেনানো। জানিয়ে দেওয়া যে—হ্যাঁ, তিনি ভারতের সংস্কৃতির একটা বড়ো অংশ অধিকার করে রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা হিন্দুত্ববাদ-বর্ণিত ন্যারেটিভের অনুসারী না। বরং ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাম-বৈচিত্র্যের সমষ্টি যে ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে, তা অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক ও শক্তিশালী।

যেমন এখানে। রাম রইলেন গৌরাঙ্গের মধ্যেই। কোনো রাজনীতি-সর্বস্ব হর্ম্যে না। অবশ্য গৌরাঙ্গের মধ্যে রামের অবস্থান-সংক্রান্ত প্রচারেও রাজনীতি রয়েছে বইকি! সে-তর্ক ভিন্ন, সেই ইতিহাসও...

২২ জানুয়ারি, ২০২৪



Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation