ভাষা-সৈনিকের সঙ্গে

'জানেন, ভাষা আন্দোলনে আমারও অবদান আছে।'—শুনে চমকে উঠেছিলাম। আমার সামনে যিনি বসে আছেন, বয়সের ভারে চলচ্ছক্তিহীন, কথাও খানিক জড়ানো, তিনি ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের কর্মী! কীভাবে? 

প্রায় ন'বছর আগের কথা। ২০১৫। আলাপ হয়েছিল বিনয় মিত্রের সঙ্গে। তখনই ৮৮ বছর বয়স তাঁর। জন্ম ১৯২৭ সালে। খুঁজতে খুঁজতে হাজির হয়েছিলাম তাঁর বাড়িতে। উদ্দেশ্য, বেলঘরিয়ার ইতিহাস লেখার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা। তখনই ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার গল্প শোনান তিনি।

আদতে ঢাকার মানুষ। পড়তেন জগন্নাথ কলেজে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকার পল্টন ময়দানে জিন্না জানান, নবনির্মিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবলমাত্র উর্দু। সেই সমাবেশে হাজির ছিলেন বিনয় মিত্রও। তাঁর কথায়, 'সমবেত জনতার সঙ্গে আমিও সুর মিলিয়ে বললাম—না না, কিছুতেই তা চলবে না।'

তারপর? বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশাল এক মিছিল বেরোয় রাজধানী ঢাকার বুকে। ছাত্ররাই প্রধান চালিকাশক্তি। সেই মিছিলে হেঁটেছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র বিনয়বাবুও। মুখে অবিরাম স্লোগান। 'সেবারই প্রথম টিয়ার গ্যাস খেলাম। চোখ জ্বালা থেকে রক্ষা পেতে রুমাল ভিজিয়ে জল দিয়ে জ্বালা কমিয়ে নিলাম। কিন্তু হাঁটা থামেনি।'

'ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাতের সময় অংশীদার থাকায় আমি গর্বিত।'

বলতে-বলতে চকচক করে উঠছিল তাঁর চোখ। ডুব দিয়েছিলেন স্মৃতিতে। ১৯৪৮-এর সেই ঢেউ-এর পর, '৪৯-এ এপার বাংলায় চলে আসেন তিনি। 'চূড়ান্ত লড়াইয়ে সামিল হতে পারলাম না'—গলায় আফসোস।

তারপর থেকেই বেলঘরিয়ায় বসবাস। আদ্যোপান্ত কমিউনিস্ট। আমার সঙ্গে যখন আলাপ হল, জীবনের শেষ পর্যায়। মারা গেলেন কয়েকমাস পরেই। কেউ জানল না—ভাষা আন্দোলনের একজন কর্মী থাকতেন এখানে। 

হয়তো তেমন বলার মতো কিছু না। আবার অনেককিছুও। '৫২-য় যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের নাম মনে রেখেছি আমরা। মনে রেখেছি মুখ্য নেতাদেরও। কিন্তু এইসব মানুষ, যাঁদের ছাড়া প্রাথমিক দিনগুলোয় প্রতিবাদের ঢেউ উঠত না, তাঁদের অবদানও অনস্বীকার্য। আমার সৌভাগ্য, পাকেচক্রে তেমন একজনের দেখা পেয়েছিলাম। এ-ও এক আবিষ্কার বইকি!

বাংলাভাষা যেন বিনয় মিত্রদের ভুলে না-যায়...

(সঙ্গের ছবিটি আমারই তোলা, ২০১৫-তে)




Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation