অবাঙ্‌মনসগোচর' কাব্যগ্রন্থের আলোচনা

'প্রতিটা অশান্তি থেকে জন্ম নেয় নতুন কথক
নতুন পাঁচালি পড়ে, দুলে-দুলে, সজল নয়ান' 

নতুন কথক আর তাঁর কথনরীতির কাছেই আমরা খুঁজে পাব দিনের শান্তি-অশান্তি। তিনিই সাজাবেন ভাষা, ধ্বনির ঐশ্বর্যে, অলংকারে। আর ওর ভিতর দিয়েই তিনি জানাবেন দিনের বাসনা, লিখে যাবেন সন্তানের জন্য ভাতের স্বপ্ন। এই ভিত্তির উপর অপার ভাঙচুরের ইমারত। অনেকগুলো দিন পেরিয়ে কখনও যেন মনে হয়, সেই ভাঙচুরই সত্যি। অপূর্ব চমক, শব্দের আশাতীত ব্যবহার, সংযম বা মহাপয়ারে গড়িয়ে যাওয়া- এসবের দরুন মূলের কথাগুলো যেন মিলিয়ে যায়। তন্ময় ভট্টাচার্যের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, সে তার কথনরীতির আচ্ছন্নতার ভিতর টেনে নিয়েই সামগ্রিক ভাবে শোনাতে পারে দিনের আর্তি।

আমাদের এই যে সময়টা, তা নানা কারণে এত আলাদা, যে সেই সময়ের ভাষাকে, সময়ের ফসলের রং-রূপকে নতুন করে দেখতে হবে। প্রবীণরা বলতে পারেন, সময় বহুবারই খারাপ হয়েছে। তা অস্বীকার করা যায় না। ক্ষমতা আর ক্ষমতাহীনের মধ্যে কবেই বা সদ্ভাব হয়েছে! না, তা নিশ্চয়ই নয়। তবু বিশ্বায়নের মায়াহরিণ যেভাবে আমাদের ঘর ভুলিয়েছে এবং প্রযুক্তি ও ফ্যাসিজমের দ্রুত দখল যেভাবে মানুষকে সংকুচিত করে ফেলেছে, তার নমুনা সম্ভবত বিরল না বললেও বহুদূর অবধি যে দেখা যায় না,তা বলাই যায়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলে যে সময়ে কিছু নেই, সে আরও বেশি করে মাথা ঘামাচ্ছে সাংস্কৃতিক বিপন্নতা নিয়ে। তাকে ভর করেই আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে দক্ষিণপন্থা, যা আমাদের হাত থেকে কেড়ে নিচ্ছে সবটুকু প্রগতির আকাশ। এ এক অদ্ভুত চক্রব্যূহ, যা থেকে বেরনোর মন্ত্র আপাতত কেউই জানেন না। তন্ময় এই সময়কে গভীর ভাবেই লক্ষ করেছে। আর সেই সূত্রে খেয়াল করেছে বাংলা কবিতার পথ। সে পথ হয়তো অসংখ্য মানুষের নয়, তবে তা ভিনগ্রহেরও নয়। অথচ কিছুটা সত্যি আছে বলেই বাংলা কবিতাকে এই খোঁটা শুনতে হয়েছে, যদিও কবিরা তাকে তেমন করে গুরুত্ব দেননি বা দিতে চাননি। এই সাধারণ থেকে দূরত্ব রচনা - সংস্কৃতি, আরও প্রসারিত ধরলে রাজনীতিতে - আমাদের ঠিক আগের সময়ের মহামারী, যার ফল ভোগ করছি আমরা অর্থাৎ বর্তমান। স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় না, স্বপ্নকে শেষ করে দেওয়া হয়। তখন সাধারণের সংস্কৃতি বলে ক্ষমতা যা তুলে ধরে, তা নেহাতই অপসংস্কৃতি-সমান। অথচ আমাদের অতীত কিন্তু তা বলে না। তার সংস্কৃতি-রাজনীতি-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ দূরত্ব অনুমোদন করে না, বরং একটা বিশেষ ধরনে মানুষকে জড়িয়ে নেয়। ঠিক এইখান থেকেই তন্ময়ের কবিতাও যেন তার অভিমুখ ঠিক করে নেয়।

অনেক সময়ই, তার কবিতায় দেখা যায় পুরনো শব্দের ব্যবহার। মনে হয় যেন, পুথি-পদাবলি-ব্রতকথার শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে সে আধুনিক সময়ের একটা কথোপকথন রচনা করতে চাইছে। বস্তুত এ সময়ের আখ্যানে এই চিহ্নটি স্পষ্টই। অতীত বিচ্ছিন্নতা আমাদের যেভাবে উপদ্রুত করেছে, তার শুশ্রূষা হিসাবেই এই ভাণ্ডারের দিকে তাকানো। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এমন নয় যে, এই শব্দগুলিকে সে অলৌকিক মহিমা দিচ্ছে। দৈবী মঙ্গলকাব্য রচনা তার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু সে গত সময়ের অস্বীকার থেকে এই সময়ের স্বীকারে পৌঁছাতে চাইছে। বিগত সময়ের উন্নাসিকতা, ঔদ্ধত্য ও রিজেকশন থেকে সে বর্তমানের সহৃদয়, সবিনয়, ইনক্লুশনে ফিরতে চাইছে। তার কবিতা তাই একটা নির্দিষ্ট কথনরীতির এবং শব্দ প্রয়োগের আটচালা নির্মাণ করেছে। আর তার মধ্যেই সে ধরে রাখছে সময়ের আর্তি। তাই তার কবিতা বলে,

'ব্যক্তির বিরুদ্ধে যেতে আমাদের ব্যক্তিগত বোধ
আপোস করেনি কিন্তু আজ এই আঁধারবেলায়
যেন স্পষ্ট ফুটে আছ তবু আজ আঁধারবেলায়
পারস্পরিক চন্দ্রে উকি দিয়ে রেতঃপাত দেখি

তবে কি ব্যক্তিই সত্য আর-সব মুদ্রণকুহক
পারস্পরিক চন্দ্রে ঢাকা সব মুদ্রণ কুহক
চন্দ্রের বিন্দুর গায়ে লেগে থাকা শ্রদ্ধাভাব অস্বীকার করি
আমাদের পয়োমন্ত বীজগুলি চমৎকার ছিল

তবে কি চমকই সত্য আর-সব হত্যাকারী দিন
তবে কি মৃত্যুই সত্য আর-সব পুনঃসম্প্রচার'

কবির হাতে দিনবদল নেই। কিন্তু দিনের বেদন কবি ছাড়া আর কে-ই বা গভীর ধারণ করতে পারেন! তন্ময়ও করেছে। সে চাইছে বিচ্ছিন্নতার অসুখ কাটুক, আর তা অতীতের সব কিছুকে অস্বীকার করে শুধু ভাঙার মধ্যে নেই। ভাঙলে, গড়তেও জানতে হয়। নইলে মাথার উপর ছাদ থাকে না। এমনই এক ছাদহীন সময়ে পৌঁছে সে মাথার উপর আবহমানের আকাশটিকেই টাঙানোর চেষ্টা করছে। সে রাজনৈতিক, তবে কোনও বিবৃতিতে নয়। বরং তার এই সামগ্রিক প্রকল্পটিই এই সংকট সময়ে খুঁজে পাওয়া রাজনৈতিক পথ। বর্তমানের এক আখ্যানকার বলেছেন, উই মাস্ট রিসার্চ আওয়ার পেইন। যন্ত্রণার পর্যালোচনা ছাড়া যন্ত্রণামুক্তির পথ নেই। তন্ময়ের কবিতা আসলে তা-ই করে। ওর কবিতার এই প্রকল্প নিয়ে নিশ্চয়ই কেউ গভীর আলোচনা করবেন। যে-প্রকল্প মানুষের মুক্তিকে শুধু এক দর্শনের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে দেখে না বলেই, বলে উঠতে পারে,

'হে দিন, করুণ দিন, তোমার পতাকা যারে দাও
বহন করার শক্তি তারা যদি এখনো না পায়
খিদের প্রকৃত অর্থ তাহলে তো ইঁদুরখাঁচায়
প্রবল চেষ্টার পরে, ক্রমশ ঝিমিয়ে, থেমে যাওয়া

হে দিন, তারার দিন, তোমাদের উন্নাসিক ছায়া
মহাজাগতিক কোনো ক্ষমায় সংশোধিত হলে
আবার তিলক কাটত, সুর উঠত ব্যথার শ্রীখোলে
দিবারাত্র নামগান, আচণ্ডালব্রাহ্মণের হরি—

হে দিন, হাতুড়িচিহ্ন, দু-বাহু ফসলে মেলে দিয়ে
কাস্তের পাশেই, এসো, বিপ্লবের দারুমূর্তি গড়ি'

আলোচক - সরোজ দরবার, ২০২৩



Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation