ব্যক্তি বনাম শিল্প ও একজন কবীর সুমন
কখনও-কখনও, বহুশ্রুত কোনো গানও নতুন চমক নিয়ে আসে। কবিতাচর্চার সুবাদে, সে-চমক প্রায়শই শব্দকেন্দ্রিক হয় আমার কাছে। যেমন 'পালকির গান'; সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা, সলিল চৌধুরীর সুরারোপ ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া। কতবার যে শুনেছি, ইয়ত্তা নেই। কয়েকদিন আগে আবার শুনতে গিয়ে থমকে গেলাম একটা শব্দবন্ধে। 'মেঠো জাহাজ সামনে বাড়ে/ ছয় বেহারার চরণদাঁড়ে'। পালকিকে মেঠো জাহাজ বলা হচ্ছে, তাও না-হয় মানা গেল। কিন্তু বেহারাদের পা আসলে দাঁড়! 'চরণদাঁড়' - এই শব্দ মাথা ছেড়ে আর বেরোল না কিছুতেই। কী অপূর্ব প্রয়োগ!
বাংলা গানে তুখোড় শব্দব্যবহার চমকে দেয় বার বার। শুধু আধুনিক গান কেন! চণ্ডীদাসের পদাবলির একেকটি শব্দ নিয়ে অফুরন্ত কথা বলা যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও প্রচুর উদাহরণ। পরবর্তীকালের বিক্ষিপ্ত কিছু গান, কিছু শব্দব্যবহার... ধারাবাহিক নয়।
প্রকৃত অর্থে তা আবার ফিরেছিল সুমনের গানে। আবার সেই ঘোর - একেকটি শব্দের কাছে নত হয়ে বসা, মোহিত হয়ে যাওয়া। শুধু শব্দই নয়, বাক্যের কাছেও। এ-নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তারপরও পুরনো হবে না কোনোদিন।
ভাবছিলাম সুমনের গানের 'আমি'-র কথাও। যে 'আমি' সর্বজনীন (উদা. 'আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায়...', 'তুমি আসবেই আমি জানি...' ইত্যাদি), সেখানে 'আমি'-র যায়গায় প্রত্যেক শ্রোতা নিজেকে কল্পনা করে নিতে পারবেন। সকলের ভাষ্য হয়ে উঠেছে উত্তমপুরুষের সেইসব ব্যবহার। কিন্তু যেখানে সরাসরি নিজের নাম ব্যবহার করেছেন বা নিজেকেই বুঝিয়েছেন সুমন (যা ঠিক ভণিতাও নয়), সেগুলি আলাদা করে নজর টানে। 'সকলে ভাবছে লিখছে সুমন/ আসলে লিখছে লালন', 'ওই সুমন চাটুজ্যেটা শেষে বেশ মুসলিম হল', 'আমি কবীরের সন্তান, যাকে কবীর সুমন বলে' ইত্যাদি - সেগুলির সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় অবস্থানগত অভিঘাত অতুলনীয়। একক ব্যক্তিই প্রতীক হয়ে উঠছেন। এতদিনে সুমন-প্রতীক নিয়েও সিরিয়াস চর্চার সময় এসেছে বোধহয়।
১৬ মার্চ। ৭৫ পূর্ণ করলেন কবীর সুমন। এমন একজন, যাঁকে ব্যক্তি হিসেবে পছন্দ করে ওঠা মুশকিল। কিন্তু গান ও সঙ্গীতজ্ঞানের সামনে নত হয়েছি বারবার। হতে বাধ্য হই, প্রত্যেকবার, প্রতিটা গান শোনার সময়। ব্যক্তি বনাম শিল্পের এই দ্বন্দ্ব, আমাদের সমসময়ে, এইভাবে আর কেউ দিতে পারেননি। শেষমেশ জয়ী হয়েছে শিল্পের অংশটুকুই। উনিশ শতকের বাংলার এক দার্শনিক রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, হাঁসের মতো জল ছেড়ে শুধু দুধটুকু শুষে নিতে। সেই পরামর্শ প্রয়োগ করেছি সুমন-সংক্রান্ত প্রতিটা ক্ষেত্রে। প্রতারিত হইনি।
নব্বইয়ের দশক ও তৎপরবর্তী অনেকেরই হয়তো অবস্থান এমনই। অনেককে এমনও বলতে শুনেছি, 'সুমনের গান যদি কৈশোর কিংবা প্রথম যৌবনে না শোনা হত, জীবন হয়তো অন্যরকম হত।' একই কথা আমারও। কৈশোরে সুমন না-শুনলে অন্য এক মানুষ হতাম। একেকটা মন বহু উপাদানের মিশ্রণে গড়ে ওঠে, আমার ক্ষেত্রে সেই উপাদানসমূহের অন্যতম সুমনের গান।
সুমনের গান শোনা ও না-শোনা - এই যে দুরকম 'অন্যরকম' হওয়া, তার হদিশ কেজো সংজ্ঞা দিয়ে মাপা যাবে না। কবিদের প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ একবার বলেছিলেন - "সাংসারিক হিসেববুদ্ধির দিক থেকে লোকে যাকে 'কাজ' বলে মনে করে, কবি হয়তো তেমন কোনো কাজ করেন না, করেন তার চেয়ে ভিন্ন রকমের কাজ।" এই যে ভিন্নরকমের কাজ, ভিন্নরকমের মন, তার এদিক-ওদিক নির্ধারণ করতে পারে সুমনের গান। রবীন্দ্রনাথের গান। গায়কি দিয়ে পারেন দিলীপকুমার রায়, গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (যা ব্যক্তিসাপেক্ষে বদলে-বদলে যায়)।
সুমন ৭৫। ব্যক্তিকেন্দ্রিক তুমুল উল্লাসের ঘটনা নয়; সে-অবকাশ তিনিই রাখেননি। নিজের বৈপরীত্য দিয়ে যে দ্বন্দ্ব জাগিয়ে রাখলেন বরাবর, তা গ্রহণ-বর্জনের ভিতরে বড়ো হলাম আমরাও। কিন্তু যে গান তিনি বেঁধে গেলেন, সেই গানের স্রষ্টাকে যদি কৃতজ্ঞতা না-জানাই, অন্যায় হবে।
'সমকাল এসে বসেছে সেখানে একা চ্যাপলিন সেজে' - এমন একটা লাইন যদি লিখতে পারতাম কোনোদিন!
(১৬ মার্চ ২০২৪)
