'অবাঙ্মনসগোচর' কাব্যগ্রন্থের আলোচনা
'অবাঙমনসগোচর' ভালো লাগার অনেক কারণ আছে। প্রথমেই প্রচ্ছদ। এত অনাড়ম্বর, মিতভাষী প্রচ্ছদ খুব কম দেখেছি। যা বাক্য ও মনের অতীত, তার বিচরণের জন্য অনেকটা শূন্যস্থান প্রয়োজন। সাত রঙের গ্রেডিয়েন্টে না ঢুকে সাদা এবং কালো – জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়া দুটি মোটিফ-কালার এই প্রচ্ছদ সাজিয়ে তোলেন কবি স্বয়ং। কেবলমাত্র 'র'-এর ফুটকিটি লালে – যেন নরম মাটিতে ঘট প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হল।
বইয়ের প্রতিটি কবিতা ভালোলাগার, না, ভালোবাসার পিছনে কারণের ফিরিস্তি সাজিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু কবিতা পড়া, আর কবিতার ভাবে সিক্ত হওয়া বড় ব্যক্তিগত ব্যাপার; আর সেইসব যত গোপন, তত আপন। বলে বোঝাতে গেলে সামান্য হলেও সেই ভাবের হানি হয়, এবং তন্ময় ভট্টাচার্যের কবিতা আমায় যা দিয়েছে, সে রসের সঙ্গে আপস করতে আমি নিতান্তই নারাজ।
তবে কবিতা লেখার সূত্রে এটুকু বলতে পারি, কবিতায় যত ছন্দ, আর যত মিলই থাক, তাদেরও অতীতে প্রতিটি কবিতার একটি স্বতন্ত্র গতি থাকে। ছন্দ যদি হয় হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি, মিল যদি হয় হাঁটার সময় ডান পায়ের সঙ্গে বাম হাত এগোনো, আমি তাদের কথা বলছি না। মনের কথা উজাড় করে দিতে দিতে কখনও মানুষ থামে, দম নেয়। একটু ইতস্তত করে পরের পদক্ষেপের আগে। সেই কিছু-না-হওয়া, নীরব মুহূর্তের মাধুর্য নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে তার সমস্ত অস্তিত্বে; তার আগামীর প্রতিটি হাসি, উচ্চারণ হয়ে ওঠে আরও মধুময়। আবার সে কখনও থামলে বুকের ভিতরটা খাঁ-খাঁ করে ওঠে – ধ্বক করে মূর্ত হয়েই হারিয়ে যায় তার চিন্তাস্রোত। বাক্য ও মনের অতীতে। সে-ই মানুষের ঈশ্বর, কবিতার কাব্য। তন্ময় ভট্টাচার্যের কবিতার চেয়েও কাব্য আমায় মুগ্ধ করেছে।
তন্ময় ভট্টাচার্যের কবিতার ভাষা আগামীতে অনেকের কাছে পৌঁছে যাক, অনেকে তাঁকে পড়ুন, আরও অনেকে আলোচনা করুন – এই আমার ঐকান্তিক ইচ্ছা। কারণ আমি নিজে তাঁর কবিতা নিয়ে সুগঠিত কাটাছেঁড়া করার জায়গায় নেই শেষ এক মাস। কথামৃতে ঠাকুর গল্প বলছেন, জেলে ছিপ ফেলে বসে আছে তো আছেই – কখন ফাতনায় টান পড়বে। ওই টানটুকু পড়লে, নিশ্চিন্ত। তেমনই কবিতা থেকে কবিতায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে, অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে তন্ময় ভট্টাচার্যের 'অবাঙমনসগোচর' – ফাতনায় টান। অন্তর্জগতের ঝাঁকিদর্শন হয়। নিশ্চিন্ত লাগে।
আমাদের লৌকিকজীবনের সীমানা যখন অজান্তেই মিশে গেছে অধ্যাত্মজীবনে, মিলনের সেই গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে আমরা যা কিছু বলবো ভেবেও বলতে পারিনি, লিখতে পারিনি, কারণ কত কী বলার থাকে আর কতটুকুই বা বলতে পারি – তন্ময় সেই সব কথা এ বইতে লিখে গেছেন।
আলোচক: শুভঙ্কর ঘোষ রায়চৌধুরী
