বেলঘরিয়ার ঐতিহাসিক ঠাকুরদালান ও তার সংস্কার


 'বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে' বইটি লেখার সময়, ২০১৫ সালে তোলা প্রথম ছবিটি। বেলঘরিয়ার এক প্রাচীন পরিবারের ঠাকুরদালান। বসতবাড়ির পাশাপাশি, এটিরও নির্মাতা উনিশ শতকের স্থানীয় জমিদার ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৫-তে যখন দেখি, ততদিনে ভগ্নপ্রায়, কড়ি-বরগা খসে পড়েছে, খসে গেছে পলেস্তারাও। গাছের ঝুরি নেমে এসে আরও ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে স্থাপত্যটিকে। অথচ এটি বেলঘরিয়ার অতীতের প্রকাশ্য দলিলগুলির মধ্যে অন্যতম। উনিশ শতকে তৈরি এই ঠাকুরদালানে রিলিফের কাজগুলিও দেখার মতো। প্লাস্টার অব প্যারিসের একাধিক মূর্তি, চুন-সুরকির পঙ্খের কাজ নজর টানত। সেসব মূর্তিতে ইউরোপীয় ঘরানার প্রভাব স্পষ্ট।

সেইসময় উপযুক্ত একটা কাজ সেরে রেখেছিলাম। তৎকালীন দুর্বল ক্যামেরা দিয়েও, যথাসাধ্য ছবি তুলে রেখেছিলাম ভেতর ও বাইরের যাবতীয় মূর্তি ও অলংকরণের। আশঙ্কা ছিল, যে-কোনো দিন ভেঙে পড়তে পারে ওই ঠাকুরদালান। নয়তো, প্রোমোটারের শ্যেনদৃষ্টি তো আছেই!

এই আশঙ্কা কত গভীরে প্রোথিত, তা টের পেয়েছি একাধিকবার। ২০১৬-য় বই বেরিয়ে যাওয়ার পরেও, প্রায়ই দেখতে যেতাম ওই ঠাকুরদালান। দেখতাম, বছর-বছর জীর্ণ হয়ে চলেছে আরও। মনে আছে, আমফানের পরের সকালেই ছুটে গিয়েছিলাম দুরুদুরু বুকে। অক্ষত দেখে, খানিক স্বস্তি। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা ঘোচেনি কোনোদিনই।

গত বছরখানেক ধরে দেখছিলাম, ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ভেতর-বাইরে পরিষ্কার করা হচ্ছে, গায়ে সিমেন্টের প্রলেপ পড়ছে, রং হচ্ছে। খুলে ফেলা হচ্ছে মুমুর্ষু কড়ি-বরগা। অথচ এইসব কর্মযজ্ঞের মধ্যেও, রিলিফ তথা অলংকরণগুলির ক্ষতি হচ্ছে না এতটুকু। সেগুলি যথাসম্ভব বাঁচিয়েই চলছে সংস্কার।

বেশ কয়েক মাস পর, সম্প্রতি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। সংস্কার সম্পূর্ণ। দিনের তুলনায় সন্ধ্যায় আরও সুন্দর লাগছে আলোকসজ্জার জন্য। দুধসাদা রং ভেতরে-বাইরে। মাথায় টেরাকোটার বিশেষ প্যানেল বসানো হয়েছে, যা আগে ছিল না। দেওয়ালে থাকা প্রাচীন মূর্তিগুলির নব্বই শতাংশই অবিকৃত; যেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল আগে থেকেই, সেগুলিরও সংস্কার করা হয়েছে যত্ন সহকারে।

এ-জীবনে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি স্থাপত্যের সংস্কার-পরবর্তী দশা দেখেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্কারের নামে ইতিহাসের ধ্বংস চলে। কোথাও-কোথাও কাজ হয় দায়সারা, অভাব থাকে যত্নের। খুব কম স্থাপত্যই উপযুক্ত আদর পায়।

সেই অভিজ্ঞতার বিপরীতে অবস্থান এ-লেখার। বেলঘরিয়ার এই কীর্তিটি আমাকে গর্বিত করেছে। এমনটি আশাতীত ছিল। সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়েরই উত্তরপুরুষদের একটি শাখা এই সংস্কার-কার্যের নেপথ্যে। এ-ও বিরল; যেখানে সবই হারিয়ে যেতে দেখি, নিজের পরিবারের ইতিহাস এভাবে বাঁচিয়ে রাখে কজন! তাও এমন খরচসাপেক্ষ কাজ! কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয় ওঁদের জন্য। জানা গেল, বর্ধমান থেকে টেরাকোটা-শিল্পী এনে অলংকরণের কাজ করা হয়েছে। আপাতত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ, অদূর ভবিষ্যতে এখানে স্থাপিত হবেন ওই পরিবারের গৃহদেবতা।

বেলঘরিয়া— এককালে অভিহিত হত গ্রাম হিসেবে। তারপর মফস্‌সল। আমাদের শৈশব-কৈশোরেও বেঁচে ছিল সেই মফস্‌সলের ছোঁয়া। দিনে-দিনে শহর হয়ে উঠছে। বাড়ছে নাকচের পরিমাণ। এমন দিনকালে এই একটি ঘটনা আমায় শান্তি ও আনন্দ দিল। প্রায় নয় বছর ধরে যে-স্থাপত্যের সঙ্গে মন জুড়ে ছিল, তার এই সদর্থক পরিণতি গর্বের।

ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষার প্রতি বাঙালির অযত্ন ও অবহেলা নিয়ে সরব হয়েছি একাধিকবার। কিন্তু বিপরীতটাও যদি তুলে না-ধরি, অন্যায় হবে। বইয়ে এর ভগ্নপ্রায় দশা সম্পর্কে দুঃখপ্রকাশ করেছিলাম। পরবর্তী সংস্করণে লিখে রাখব সংস্কারের তথ্যও। এটুকুই তো পারি!

 ২১ অক্টোবর, ২০২৪

২০১৫-তে তোলা কয়েকটি ছবি









ছবি: তন্ময় ভট্টাচার্য






Podcast: Language & Literature ft. Tanmoy Bhattacharjee


Video: Panel Discussion at Aaj Tak

Video: Poetry Recitation